বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কি সত্যিই কম? ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের সঙ্গে লিটারে কত পার্থক্য
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কত? অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ডিজেলের দাম কি কম? জ্বালানি তেলের দাম পরিবর্তনের পর এই প্রশ্নগুলো এখন অনেকেরই মনে আসছে।
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে বাংলাদেশে নতুন জ্বালানি তেলের দাম কার্যকর হয়েছে। নতুন দামে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে শুধু বাংলাদেশের দাম জানলেই পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। ভারত, নেপাল, পাকিস্তানসহ আশপাশের কয়েকটি দেশের ডিজেলের দাম বাংলাদেশি টাকায় হিসাব করে দেখলে তুলনাটা আরও পরিষ্কার হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম কত?
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর নতুন মূল্য অনুযায়ী বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম হলো:
জ্বালানি- প্রতি লিটারের দাম
ডিজেল- ১৩৫ টাকা
পেট্রোল- ১৬০ টাকা
অকটেন- ১৬৫ টাকা
কেরোসিন- ১৫৫ টাকা
এর আগে ১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা। অর্থাৎ নতুন দামে ডিজেলের মূল্য প্রতি লিটারে ২০ টাকা বেড়েছে।
বিভিন্ন দেশে ডিজেলের দাম কত?
বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করার জন্য সরকার যে দেশগুলোর ডিজেলের দাম উল্লেখ করেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ আরও কয়েকটি দেশ। নিচের হিসাবগুলো বাংলাদেশি টাকায় প্রতি লিটার হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
দেশ/অঞ্চল| ডিজেলের দাম (৳/লিটার)| বাংলাদেশের তুলনায়
🇧🇩 বাংলাদেশ| ১৩৫.০০| —
🇮🇳 কলকাতা, ভারত| ১৩৪.৭৬| ০.২৪ টাকা কম
🇻🇳 ভিয়েতনাম| ১৩৭.০০| ২ টাকা বেশি
🇲🇻 মালদ্বীপ| ১৪০.০০| ৫ টাকা বেশি
🇦🇪 দুবাই, UAE| ১৪৪.৭৯| ৯.৭৯ টাকা বেশি
🇹🇭 থাইল্যান্ড| ১৫১.২২| ১৬.২২ টাকা বেশি
🇳🇵 নেপাল| ১৬১.২৪| ২৬.২৪ টাকা বেশি
🇲🇲 মিয়ানমার| ১৬৪.৮৩| ২৯.৮৩ টাকা বেশি
🇵🇭 ফিলিপাইন| ১৬৮.৫৩| ৩৩.৫৩ টাকা বেশি
🇱🇰 শ্রীলঙ্কা| ১৭৯.৪২| ৪৪.৪২ টাকা বেশি
🇵🇰 পাকিস্তান| ১৮৫.৪৮| ৫০.৪৮ টাকা বেশি
তাহলে বাংলাদেশে কি ডিজেলের দাম সবচেয়ে কম?
না। এই তুলনায় কলকাতায় ডিজেলের দাম বাংলাদেশ থেকে সামান্য কম।
বাংলাদেশে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, আর কলকাতায় বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩৪.৭৬ টাকা। অর্থাৎ পার্থক্য মাত্র ২৪ পয়সা।
তবে তালিকায় থাকা ভিয়েতনাম, মালদ্বীপ, UAE, থাইল্যান্ড, নেপাল, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে ডিজেলের দাম বাংলাদেশের চেয়ে বেশি।
তাই “বাংলাদেশে সব দেশের চেয়ে ডিজেলের দাম কম” বলা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, তুলনায় থাকা বেশ কয়েকটি দেশের চেয়ে বাংলাদেশে ডিজেলের দাম কম এবং কলকাতার দামের সঙ্গে প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ বনাম ভারতের ডিজেলের দাম
বাংলাদেশ ও ভারতের তুলনায় সবচেয়ে interesting বিষয় হলো দুই দেশের দামের পার্থক্য খুবই কম।
- বাংলাদেশ: ১৩৫ টাকা/লিটার
- কলকাতা: ১৩৪.৭৬ টাকা/লিটার
- পার্থক্য: ০.২৪ টাকা/লিটার
অর্থাৎ প্রতি লিটারে পার্থক্য মাত্র ২৪ পয়সা।
তবে এখানে মনে রাখতে হবে, এটি কলকাতার দাম, পুরো ভারতের জন্য একই দাম নয়। বিভিন্ন রাজ্য ও শহরে জ্বালানি তেলের খুচরা দাম আলাদা হতে পারে।
বাংলাদেশ বনাম নেপাল: ডিজেলের দামে কত পার্থক্য?
নেপালে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম বাংলাদেশি টাকায় ১৬১.২৪ টাকা।
বাংলাদেশে দাম ১৩৫ টাকা হওয়ায় পার্থক্য:
১৬১.২৪ − ১৩৫ = ২৬.২৪ টাকা
অর্থাৎ এই তুলনা অনুযায়ী নেপালে প্রতি লিটার ডিজেল বাংলাদেশের চেয়ে ২৬.২৪ টাকা বেশি।
বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান: কোথায় ডিজেল বেশি দামী?
পাকিস্তানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম বাংলাদেশি টাকায় ১৮৫.৪৮ টাকা।
বাংলাদেশে একই সময়ে দাম ১৩৫ টাকা।
পার্থক্য:
১৮৫.৪৮ − ১৩৫ = ৫০.৪৮ টাকা
অর্থাৎ এই তালিকা অনুযায়ী পাকিস্তানে প্রতি লিটার ডিজেল বাংলাদেশের চেয়ে ৫০.৪৮ টাকা বেশি।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কেন বাড়ানো হয়েছে?
বাংলাদেশ সরকার ২১ সেপ্টেম্বর নতুন জ্বালানি তেলের দাম কার্যকর করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নতুন মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, দেশের তুলনায় প্রতিবেশী দেশে দামের পার্থক্য থাকায় জ্বালানি পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছিল। সেই বিষয়টিও মূল্য সমন্বয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি দামের সম্পর্ক
বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, পরিবহন ও শিপিং খরচ এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার দেশের জ্বালানি তেলের দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের মূল্য চাপ তৈরি হয়েছে। Reuters জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যার কারণে আন্তর্জাতিক ডিজেলের বাজারেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
তেলের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের কী প্রভাব পড়তে পারে?
ডিজেল শুধু গাড়িতে ব্যবহৃত হয় না। বাংলাদেশে পরিবহন, কৃষি, পণ্য পরিবহন এবং বিভিন্ন শিল্পখাতেও ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে।
তাই ডিজেলের দাম পরিবর্তিত হলে বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়তে পারে। যেমন:
- পরিবহন খরচ বাড়তে পারে
- পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়তে পারে
- কৃষিতে সেচের খরচ প্রভাবিত হতে পারে
- উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে
- বিভিন্ন পণ্যের বাজারদামে চাপ তৈরি হতে পারে
তবে কোনো একটি পণ্যের দাম ঠিক কতটা পরিবর্তিত হবে, তা শুধু ডিজেলের দামের ওপর নির্ভর করে না। উৎপাদন, সরবরাহ, পরিবহন এবং বাজারের অন্যান্য খরচও এতে ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশে ডিজেলের দাম কম হলেও এর মানে কী?
কোনো দেশের জ্বালানি তেলের দাম অন্য দেশের তুলনায় কম হলেই সেই দেশের মানুষের জন্য জ্বালানি তুলনামূলকভাবে বেশি সাশ্রয়ী—এমন সিদ্ধান্ত সরাসরি দেওয়া যায় না।
কারণ দেশভেদে মানুষের আয়, গাড়ির ব্যবহার, করব্যবস্থা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য জীবনযাত্রার খরচ আলাদা।
তাই বাংলাদেশে ডিজেলের দাম কত—এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তুলনা করার সময় কোন তারিখের দাম, কোন শহর বা অঞ্চল এবং কোন মুদ্রার বিনিময় হার ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এক নজরে বাংলাদেশ বনাম অন্যান্য দেশ
এই তুলনায় বাংলাদেশের ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা প্রতি লিটার।
সবচেয়ে কাছাকাছি দাম পাওয়া যাচ্ছে কলকাতায়—প্রায় ১৩৪.৭৬ টাকা। ভিয়েতনামে দাম ১৩৭ টাকা, আর পাকিস্তানে ১৮৫.৪৮ টাকা।
অর্থাৎ তালিকাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের দাম তুলনামূলকভাবে কম হলেও সবচেয়ে কম নয়।
শেষ কথা
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বিশেষ করে ডিজেলের দাম অনেক দেশের তুলনায় কম। তবে কলকাতার তুলনায় বাংলাদেশের ডিজেলের দাম সামান্য বেশি—মাত্র ২৪ পয়সা প্রতি লিটার।
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে বাংলাদেশে ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে জ্বালানি তেলের দাম পরিবর্তনশীল। আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় ও দেশের মূল্য নির্ধারণ নীতির কারণে ভবিষ্যতে দাম আবার পরিবর্তিত হতে পারে। তাই এই তুলনাটি ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী বিবেচনা করা উচিত।
